'এক লাখ কোটি টাকা সরানো হয়েছে'
কারসাজির মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে ২০১১-১২ অর্থবছরের বাজেটের অনুন্নয়ন খাতের সমপরিমাণ এক লাখ কোটি টাকার বাজার মূলধন লুট হয়ে গেছে। এ টাকা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করা হয়েছে। বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত 'শেয়ারবাজার দুর্নীতি ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষা' সেমিনারে এ অভিযোগ করা হয়।
গতকাল রবিবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া উপস্থিত ছিলেন। সংগঠনের আহ্বায়ক আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
সেমিনারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার বলেন, '১৯৯৬ সালেও একইভাবে তারা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থ লুট করেছে। আমরা ক্ষমতায় গেলে পুঁজিবাজারের এই কেলেঙ্কারীর বিচার করব। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের ক্ষতিপূরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।'


দর্শক সারিতে বসে আলোচকদের বক্তব্য শোনেন খালেদা জিয়া। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অধ্যাপক এম এ মাজেদ, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য আ ফ ম ইউসুফ হায়দার, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, নজরুল ইসলাম খান,
চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, অধ্যাপক এম এ মান্নান, আহমেদ আজম খান, যুগ্ম মহাসচিব আমান উল্লাহ আমান, মাহবুব উদ্দিন খোকন, বিরোধীদলীয় প্রধান হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক, ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আ ন হ আখতার হোসেন প্রমুখ নেতা উপস্থিত ছিলেন। সেমিনার পরিচালনা করেন পেশাজীবী পরিষদের সদস্যসচিব অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন।
এম কে আনোয়ার বলেন, 'সরকার নানা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে মানুষের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে।'
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসির ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ সংস্থাকে দলীয়করণমুক্ত করতে হবে। এর সংস্কার করতে হবে।
মাহমুদুর রহমান তাঁর প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, আওয়ামী লীগের ক্ষমতা গ্রহণের দিন ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এঙ্চেঞ্জে (ডিএসই) বাজার মূলধন ছিল এক লাখ চার হাজার ২৯৭ কোটি টাকা। গত ৫ ডিসেম্বর বাজার মূলধন দাঁড়ায় তিন লাখ ৬৮ হাজার ৭১৫ কোটি টাকা। এ সময়ে বাজার মূলধন বৃদ্ধি পায় দুই লাখ ৬৮ হাজার ৪১৮ কোটি টাকা। এরপর বিপর্যয় শুরু হয়। ডিসেম্বর-জানুয়ারির বাজার বিপর্যয়ের পর গত ২ জুন বাজার মূলধন দাঁড়ায় দুই লাখ ৬৮ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা। বাজার ধসের পর বাজার মূলধন কমে যায় এক লাখ ৮৫ কোটি টাকা। এই টাকার পরিমাণ ২০১১-১২ অর্থবছরের বাজেটের অনুন্নয়ন খাতের সমপরিমাণ। এই টাকা বাজার থেকে লুট করা হয়েছে। লুটের টাকার সিংহভাগ দেশের বাইরে চলে গেছে বলেও দাবি করেন মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডলারের দাম যখন কমছে তখন বাংলাদেশে বাড়ছে। ডলারের মাধ্যমে টাকা পাচার হলেই কেবল ডলারের দাম বাড়ে। এভাবে আমেরিকা, ইংল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে শেয়ারবাজারের টাকা পাচার করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণের দিন ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩৭৮ কোটি ৮৭ টাকা। গত ৫ ডিসেম্বর শেয়ারবাজারে সর্বোচ্চ লেনদেনের দিনে এই পরিমাণ ছিল তিন হাজার ২৪৯ কোটি ৫৭ লাখ। গত ২ জুন এই পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬০৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। একই সময়ের ডিএসইর সাধারণ মূল্য সূচকের তথ্যও উপস্থাপন করেন তিনি। ডিএসইর সাধারণ মূল্য সূচক ছিল ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি ২৭৫৭ পয়েন্ট। গত ৫ ডিসেম্বর এই সূচক ছিল ৮৯১৯ পয়েন্ট। গত ২ জুন এ সূচক কমে দাঁড়িয়েছে ৫৭৬০ পয়েন্ট। তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বাজারকে অতিমূল্যায়িত করে বাজার থেকে এ টাকা লুট করা হয়। বুক বিল্ডিং, স্প্লিট, অগ্রাধিকার শেয়ার, প্লেসমেন্ট ও ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে কারসাজি করা হয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রীর ভাইয়ের প্রতিষ্ঠান কেপিসিএল, ওশান কনটেইনার বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে কম্পানির শেয়ারের দর নির্ধারণ করে ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। এর মাধ্যমে এই দুটি প্রতিষ্ঠান বাজার থেকে এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা লুট করেছে। এসইসির নির্ধারিত পিই ৪০ -এর অনেক ওপরে কেপিসিএলের ৬৯.৬০ পিই নিয়ে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়।
বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের আহ্বায়ক আরো জানান, কেপিসিএল, ওশান কনটেইনারের মতো আরেক কম্পানি অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি আ হ ম মুস্তফা কামালের প্রতিষ্ঠান সিএমসি কামাল। এই কম্পানিটি লোকসানে থাকলেও রাইট শেয়ার ইসুর মিথ্যা তথ্য দিয়ে শেয়ারের দাম বাড়িয়েছে। ২০০৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর এই কম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস ছিল ঋণাত্মক ৩.৪৫ টাকা। রাইট ইস্যু করার জন্য কম্পানিটি এ ব্যাপারে মিথ্যা তথ্য দিয়ে তা দেখায় ধনাত্মক ৫.৩১ টাকা। এভাবে ২০০৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর এর প্রকৃত ইপিএস ছিল ঋণাত্মক ১৯.২৪ টাকা। কম্পানিটি মিথ্যা তথ্য দিয়ে দেখায় ঋণাত্মক ১০.৪৮ টাকা। এ কম্পানির সম্পদের বিবরণে নানা ধরনের জালিয়াতির তথ্য তুলে ধরেন মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন, কম্পানিটি ২০০০ সাল থেকে ২০০৯ পর্যন্ত কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা না করে জেড ক্যাটাগরিতে অবস্থান করে নেয়। হঠাৎ করে ২০১০ সালে ১০ শতাংশ স্টক ঘোষণা করে এ ক্যাটাগরিতে স্থান করে নেয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণের দিন এ কম্পানির প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ৫.৩০ টাকা। ৫ ডিসেম্বর সর্বোচ্চ লেনদেনের দিনে এর দাম পেঁৗছায় ২৯৭ টাকা। এ বছর গত ২ জুন এর শেয়ারের দাম ছিল ৬৩ টাকা। এভাবে এ কম্পানিটি প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ২৯৩ টাকা উঠিয়ে নিয়েছে। কম্পানির পরিচালকরা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
শেয়ারবাজারে বুদবুদ তৈরিতে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা ছিল উল্লেখ করে মাহমুদুর রহমান এ-সংক্রান্ত 'তথ্য-প্রমাণ' তুলে ধরেন। বিও অ্যাকাউন্ট দ্বিগুণ করার ঘোষণা, অ্যাকাউন্টধারীর সংখ্যা ২০০৯ সালে ১৪ লাখ থেকে বর্তমানে ৩৪ লাখে উন্নীত করা, দেশে-বিদেশে স্টক এঙ্চেঞ্জের রোড শো, ব্রোকারেজ হাউসের সংখ্যা ২০০৯ সালের ২৭২ থেকে শাখাসহ ৬৪১ উন্নীত, ১৯৯৬ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হওয়ার আশ্বাস_এ সব কিছুই শেয়ারবাজারে বুদবুদ তৈরি করেছিল। ২০১০ সালের এপ্রিলে এসএমই খাতে অধিক বিনিয়োগের নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্দেশের আগে বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৩ হাজার ৯৯৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা। নির্দেশের লক্ষ্যমাত্রা দাঁড়ায় ৩৮ হাজার ৮৪৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। বছর শেষে এসএমই খাতে বিতরণ দেখানো হয় ৫৩ হাজার ৪৫৪ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
জনগণ যাতে নিরাপদ বিনিয়োগ থেকে সরে যায়, সে জন্য ২০১০ সালের জুলাই মাসে সঞ্চয়পত্রের ওপর সুদ ও বিনিয়োগসীমা হ্রাস করে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে সাধারণ মানুষ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে উৎসাহিত হন। এরপর যখন লুটপাট শেষ হয়ে গেল, তখন আবার সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বাড়িয়ে দিয়েছে।
অগ্রাধিকার শেয়ারের মাধ্যমে টাকা উত্তোলনকারী কম্পানির নাম প্রকাশ করেন পেশাজীবী পরিষদের নেতা। তিনি জানান, বেঙ্মিকো ফার্মা ৪১০ কোটি টাকা, সামিট পাওয়ার ৩০০ কোটি টাকা, আফতাব অটোমোবাইলস ১৮০ কোটি টাকা, পিপলস লিজিং ১২০ কোটি এবং বাংলাদেশ থাই ৭৫ কোটি টাকা নিয়ে গেছে। লকইনের ব্যবস্থা না থাকায় অগ্রাধিকার শেয়ারের মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের টাকা লুট করা হয়েছে। এভাবে তারা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের লুটে নিয়েছে। মাহমুদুর রহমান প্রশ্ন করেন, বিনিয়োগকারীদের এত টাকা যখন লুট হলো, তখন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কোথায় ছিল? দুদক আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হয়েছে। দুদক ব্যবহৃত হয়েছে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি-নিপীড়নে।
ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং দুদকের কর্মকর্তাদের পদত্যাগের দাবি করেন মাহমুদুর রহমান। পাশাপাশি আরো সাত দফা দাবি উপস্থাপন করেন। এ দাবির মধ্যে রয়েছে_ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের কাছে সরকারের ক্ষমা প্রার্থনা, লুটপাটের অর্থ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ফেরত দেওয়া, সহজ শর্তে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ঋণ দেওয়া, বিনিয়োগকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করা, লুটপাটকারীদের বিচার, শেয়ারবাজার কার্যক্রম সম্পর্কে স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন এবং এসইসিতে দুর্নীতি-দলীয়করণের অবসান ঘটানো।


সূত্র:কালের কণ্ঠ, 20/06/2011

Categories:

Leave a Reply

SM World